ধারাবাহিকভাবে আমানত কমে যাওয়ায় ব্যাংকটিতে তীব্র তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রক্ষিতব্য ইসলামী ব্যাংকের সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) ঘাটতিতে পড়েছে। সংকট সামাল দিতে গতকাল নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চেয়ে আবেদন করেছে শরিয়াহ্ভিত্তিক বৃহত্তম ব্যাংকটি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চেয়ে আবেদন করেছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে টাকা দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।’
ঈদুল আজহার ছুটি শুরুর আগের দিন ২৪ মে সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জোবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। ওইদিন রাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নতুন চেয়ারম্যানকে ‘বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ’ আখ্যায়িত করে ১ জুন থেকে ব্যাংকটির গ্রাহকরা আন্দোলন করছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে আতঙ্কিত গ্রাহকরা ব্যাংকটি থেকে আমানত তুলে নিচ্ছেন।
ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মে ব্যাংকটির আমানত স্থিতি ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে ৭ জুন এ স্থিতি ১ লাখ ৮০ হাজার ১৪১ কোটি টাকায় নেমে আসে। সে হিসাবে মাত্র পাঁচ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের আমানত কমে ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। গত দুইদিনেও ব্যাংকটির আমানত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ইসলামী ব্যাংকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার আগের দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি জমা ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার সেটি কমে ৫০০ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে। গত সপ্তাহেই সিআরআরে ঘাটতি শুরু হয়েছিল। এখন প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্ট নেতিবাচক ধারায় (ঋণাত্মক) চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’ ব্যাংকটির আরো কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাও একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন।
এদিকে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে গতকালও নবম দিনের মতো ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ সারা দেশের শাখাগুলোর সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও মানববন্ধন হয়েছে। রাজধানীর দিলকুশায় ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে কয়েকশ আন্দোলনকারী অবস্থান নেন। অবস্থান কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেয়া চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগ দাবি করা হয়।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত ইসলামী ব্যাংকের মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৭ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকার আমানত জমা ছিল। বিপরীতে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ (ঋণ) করেছে ব্যাংকটি। বিতরণকৃত এ ঋণের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই এখন খেলাপি। ব্যাংকটি থেকে কেবল এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ২৮৮ কোটি টাকা লোকসান দেয়া ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা এখন তিন কোটিরও বেশি।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সংসদে বিতর্ক: এদিকে গতকাল জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী নোটিস দেন। নোটিসে ব্যাংকটির শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেয়া এবং ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানান তিনি।
নোটিসের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিরোধী দলের নোটিসে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেই বৈধ ও প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের কাছে এ মালিকানা ফেরত দেয়ার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ কারা কত শতাংশ শেয়ারের মালিক, তা প্রকাশ করার দাবি জানিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অর্থমন্ত্রী ও গভর্নরকে অনুরোধ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘শেয়ারহোল্ডাররা তারা কীভাবে খরিদ করেছেন সেটা ভিন্ন বিতর্ক, সেটা দুদকের তদন্ত হতে পারে, মামলা হতে পারে। কিন্তু শেয়ারহোল্ডাররা শেয়ারহোল্ডারই।’
জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘একবার দখল করা ব্যাংক বেদখল হয়ে যাবে, তার যে যাতনা হচ্ছে সেটা তারা বুঝতে পারছেন।’ ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়।’
ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে ব্যাংক কোম্পানি আইনে দেয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫, ৪৬, ৪৭ ও ৪৯ ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে জনস্বার্থ, আমানতকারীদের স্বার্থ এবং ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষায় নির্দেশনা দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তারা চাইলে চেয়ারম্যান থেকে পরিচালনা পর্ষদ পর্যন্ত অপসারণ এবং পর্ষদ বাতিলের ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংককে ন্যায়নীতির পথে ফেরানোর কথা বলেছে জামায়াতে ইসলামী। ওই ন্যায়নীতির পথে ফেরত আসার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুব চমৎকার চমৎকার কিছু কথা বলেছেন। উনি বলেছেন যে শেয়ারহোল্ডার তো শেয়ারহোল্ডার। সে কীভাবে শেয়ারহোল্ডার হয়েছে এটা পরে দেখা যাবে। এটা পরে কেন? এটা আগেই এক্সপোজ (প্রকাশ) হয়ে গেছে। সারা দুনিয়া জানে, ওনার মতো একজন বিজ্ঞ মানুষ জানেন না। আমি এটা বিশ্বাস করি না।’
এস আলমের নাম উল্লেখ না করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এ ব্যাংক থেকে নিজের নামেই উনি একা নিয়েছেন ৮২ হাজার কোটি টাকা। আর তার সমুদয় শেয়ার যেগুলো তিনি কিনেছেন ৮২ পার্সেন্টের মালিক হয়ে গেছেন, এগুলোর মূল্য হচ্ছে মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিনি কৈয়ের তেল দিয়ে শুধু কৈ ভাজেন নাই, শোল মাছও ভেজেছেন এবং সব ব্যাংক থেকে ডাকাতি করা টাকা।’
তিনি বলেন, ‘জোরজবরদস্তি করে যাদের কাছ থেকে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারগুলো ডাকাতি করে নেয়া হয়েছিল, অনতিবিলম্বে সসম্মানে সেই মূল্যেই তাদের কাছে আবার শেয়ারগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে। এরপর সরকার সব নিয়ম-কানুন মেনে বোর্ড গঠন করবে, পরিচালনা করবে, আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘এস আলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাংকটাকে ধ্বংস করেছেন শেখ হাসিনা। আমরা এখন স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি সেই এস আলমকে আবার ফিরে আসার পথ করা হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি যখন ডেপুটি গভর্নর তখন এস আলমের সব অপকর্মের তিনি ছিলেন সহযোগী। সেই হিসেবে তিনি একটা প্রাইজ পেয়েছিলেন।’